প্রাচীনকালে অনেক ঐতিহ্যের মধ্যে ছিল পরলোকগত ঈশ্বর চন্দ্র গুহের চৈতন্য নার্সারী ও ফোরটাঙ্কস গার্ডেন। ঈশ্বর চন্দ্র্র গুহ একজন প্রথিতযশা আইনজ্ঞ ছিলেন। আইন ব্যবসায় উপার্জিত অর্থ ব্যয়ে তিনি মহকুমা শহরের পীঠস্থান বোসপাড়া এলাকায় (লম্বগাছের পশ্চিম পার্শ্বে) ৪৫ বিঘা জমিতে গড়ে তুলেছিলেন চৈতন্য নার্সারী ও ফোরটাঙ্কস গার্ডেন। ১৮৮৪ থেকে ১৮৯৪ এই দীর্ঘ ১০ বছর তিনি বিভিন্ন পরীা-নিরীার মধ্য দিয়ে নার্সারী ও উদ্যানের ব্যাপ্তি ঘটিয়ে এর পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়েছিলেন। চৈতন্য নার্সারী ছিলো উপমহাদেশের প্রথম কৃষি ও উদ্যান উন্নয়ন প্রতিষ্ঠার অগ্রদূত। এই নার্সারী প্রতিষ্ঠাতা ঈশ্বর চন্দ্র্র গুহ হলেন বাংলাদেশ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষপ্রথা ও বিদেশী উদ্ভিদ প্রবর্তনের পথিকৃত। এই নার্সারীটি নানা দেশের ৪৬৬৮টি বিভিন্ন জাতের ফুল-ফল, লতা-গুল্ম বাহারি ও অর্থকরী বৃক্ষের পরিব্যাপ্ত ছিল। চৈতন্য নার্সারী ও ফোরটাঙ্কস গার্ডেনের সুখ্যাতি কেবল ততকালীন বৃটিশ-ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ঈশ্বর চন্দ্র গুহ স্বপ্রচেষ্টায় ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, নিউজিল্যান্ড, জাভা, মরিশাস, ফিলিপিন, আন্দামান, রাশিয়া, তুরস্ক, পারস্য, আরব, আফগানিস্তান, চীন, মালয় ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশ ও দ্বীপপুঞ্জ থেকে বহুজাতের দুষ্প্রাপ্য ফল-ফুল, লতা-গুল্ম বাহারি উদ্ভিদ ও মূল্যবান বৃরে চারা ও বীজ এনে নার্সারীতে রোপন করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল চৈতন্য নার্সারীকে একটি আদর্শ ও দৃষ্টান্তমূলক নার্সারী ও উদ্যানে পরিণত করা। ঈশ্বর চন্দ্র গুহ ততকালীন কোন বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে ফলিত উদ্ভিদ বা কৃষি বিজ্ঞানের উপর অধ্যয়ন করেননি। কিন্তু নার্সারী প্রতিষ্ঠায় যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা তথ্যানুসন্ধান ও গবেষণা করেন তাতে তার বিজ্ঞান মনস্ক পরিচয় মেলে। তিনি বিদেশি উদ্ভিদ এ দেশের মাটিতে বা জলবায়ুতে না জন্মানোর সনাতনী ধারণা মিথ্যা প্রমাণ করেছিলেন। তিনি জাপানের বিভিন্ন অঞ্চলের মৃত্তিকা এনে এ দেশের মৃত্তিকার সঙ্গে গুণগত পার্থক্য নির্ণয় করেন। এ ছাড়াও ঈশ্বর চন্দ্র গুহ চৈতন্য নার্সারীতে অর্থকরী কর্পুর বৃরে চাষ করে ভারত উপমহাদেশের খ্যাতি লাভ করেন। নার্সারী ও উদ্যানটি কেমন পরিব্যাপ্ত ছিল তা নার্সারীর বিশাল ক্যাটালগ সাী। নার্সারীর ক্যাটালগে ৪৬৬৮টি বৃরে নাম রয়েছে। ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কে যে কয়টি পাম গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সেগুলো জামালপুরের ঈশ্বর চন্দ্র গুহ প্রতিষ্ঠিত চৈতন্য নার্সারীর লুপ্ত ঐতিহ্য বহন করছে। চৈতন্য নার্সারীর সূতিকাগার ছিল তার ফোরটাঙ্কস গার্ডেন যা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে স্থাপিত এদেশের সর্ববৃহত প্রথম আধুনিক উদ্যান। এই উদ্যানটি ফলোদ্যান, ফুলোদ্যান, জলোদ্যান, চারা উৎপাদনের জন্য সিড বেড এবং দুষ্প্রা ও বিচিত্র জাতের উদ্যান শোভাকর উদ্ভিদ দ্বারা শ্রেণীভেদে ছিল বিভক্ত ও বিন্যস্ত। এ ছাড়াও ছিল উদ্যান অভ্যন্তরে আঁকাবাঁকা পথ, কৃত্রিম পাহাড়, বিরাট চৌবাচ্চা ও গ্রিন হাউজ। উদ্যানের কৃত্রিম সৃষ্টির মধ্যে গ্রিন হাউজটি ছিল ঈশ্বর চন্দ্র্র গুহের এক বিস্ময়কর ও অনবদ্য সৃষ্টি। যেখানে নিয়ন্ত্রিত উত্তাপে ফার্ণ, অর্কিডসহ বিদেশি বহুজাতের ফুলের চাষ করা হতো। উদ্যান ছিল কীটভুক্ত তরুসহ ৩৬৪ প্রকার দু®প্রাপ্য অর্কিড, ৭০০ প্রকার গোলাপ, ৩১১ প্রকার ফার্ণ এবং আফ্রিকার পাম গাছ, ওয়াটার পলি, আমেরিকার আমাজান লিলিসহ এই উপমহাদেশে সর্বপ্রথম তিনিই চাষ করে সফল হন। ঈশ্বরচন্দ্র গুহ তার নার্সারীতে উৎপন্ন আমাজান লিলি দেশজ নাম দেন ‘নীল পদ্ম’। চৈতন্য নার্সারীটি বিশ্বব্যাপী খ্যাতির কেন্দ্রে পরিণত হয়। দেশ-বিদেশের উদ্যান নার্সারীর জন্য বীজ ও চারা সংগ্রহকারীদের সুবিধার্থে ঈশ্বর চন্দ্র গুহ চৈতন্য নার্সারীর মনোগ্রাম সংবলিত একটি বিজ্ঞাপন ও উদ্ভিদের শ্রেণীবিন্যাস করে বর্ণানুক্রমে তার বৈজ্ঞানিক ও দেশজ নাম এবং মূল্য তালিকাসহ একটি ক্যাটালগ ছাপিয়েছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার বোটানিক্যাল গার্ডেন, রাশিয়ার ও মরিশাসের সরকারি বন ও উদ্যানের জন্য এই নার্সারী থেকে বীজ ও চারা বিক্রয়লব্দ অর্থ দিয়ে নার্সারী ও উদ্যানের মালী, শ্রমিক ও অন্যান্য কর্মচারীদের বেতনভাতা ও পরিচালনা ব্যয় যোগাতেন। দেশ-বিদেশের বহু গুণী-সুধী ও বরেণ্য ব্যক্তিরা এই নার্সারী ও উদ্যান পরিদর্শন করে মুগ্ধ হন। ১৯১৭ সালে বাংলার লাট বাহাদুর লর্ড রোনাল্ডস চৈতন্য নার্সারী পরিদর্শনে জামালপুর মহকুমা শহরে আসেন। ১৯২৩ সালে ঈশ্বর চন্দ্র্র গুহের ৬৫ বছরের জীববনাসানের পর অর্থ সঙ্কট ও পরিচর্যার অভাবে চৈতন্য নার্সারী ও ফোরটাঙ্কস গার্ডেন-এর সজিবতা লুপ্ত হতে থাকে। ঈশ্বর চন্দ্র গুহ দীর্ঘ ৪০ বছরের সাধনায় যে দৃষ্টান্তমূলক নার্সারী ও উদ্যান প্রতিষ্ঠা করেন তা মৃত্যুর পর মাত্র আশি বছরেই নার্সারী ও উদ্যানের অস্তিত্ব আজ বিলীন। জামালপুর শহরের যে এলাকায় ৪৫ বিঘা জমির উপর ঈশ্বর চন্দ্র গুহের বিজ্ঞান মনস্ক চিন্তায় চৈতন্য নার্সারী এবং ফোরটাঙ্কস গার্ডেন গড়ে উঠেছিল সেখানে কেবলি এখন জনপদ, পাড়া মহল্লা, বাসাবাড়ি, আর ইট-সুড়কির দালানকোঠা। শহরের স্টেশন রোডের শীর্ণবিবর্ণ গর্জন বৃ ও বোসপাড়ার পানির ট্যাঙ্ক সংলগ্ন পাম্প গাছগুলো এখনো চৈতন্য নার্সারীর লুপ্ত ঐতিহ্যের স্মৃতিবহন করছে। (ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় লম্বা গাছটি সম্প্রতি কেটে ফেলা হয়েছে)।