জামালপুরের বুক চিরে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র নদের পলিমাটি শুধু কৃষি ভূমিকে উর্বর করে সোনার ফসলই দান করেনি। পলিবিধৌত জামালপুরের মাটিতে জন্ম নিয়েছেন অনেক গুণী-জ্ঞাণী ব্যক্তি, সাহিত্যিক, শিল্পী, চারুকলাবিদ, ক্রীড়াবিদ, রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী, সংস্কৃতিকর্মী প্রমুখ। সুদূর অতীত কাল থেকে দীর্ঘদিনের ঐকান্তিক সাধনায় শত প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে এইসব সাহিত্য সংস্কৃতি সাধকেরা তাদের আপন মনের মাধুরী দিয়ে রচনা করে দিয়ে গেছেন বিভিন্ন সাহিত্য-শিল্প। অতীতের সেই সব সাহিত্যিক শিল্পীরা সমাজ জীবনের বিচিত্র চিত্র-রূপায়নের মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতির কর্মসাধনের পথ রচনা করে দিয়ে গেছেন। তাদের মধ্যে এখনো রয়েছেন চলচ্চিত্র পরিচালক আমজাদ হোসেন, অভিনেতা আনোয়ার হোসেন, নাট্যকার আব্দুল্লাহ আল মামুন, চিত্রশিল্পী বীরেন সোম এর নাম উল্লেখযোগ্য। জামালপুরে অতীতের সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষিতে স্বাভাবিক কারণেই প্রধানতঃ রাজা জমিদারদের উদ্যোগেই সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক অনুষ্ঠানাদি হতো। তারাই ছিলেন হর্তাকর্তা, উদ্যোক্তা, আয়োজক, ব্যবস্থাপক। আমজনতার সেইসব সভানুষ্ঠানে যোগদান সহজসুলভ ছিলো না। অতীত ইতিহাসে দেখা যায় জমিদার প্রধান এলাকাগুলোই প্রধানতঃ সাহিত্য সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। রাজা জমিদারদের মধ্যে অনেকে শিল্পী সাহিত্যিকদের পৃষ্ঠপোষকতাও করতেন। বিভিন্ন এলাকার মতো জামালপুরেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। যেমন, শেরপুর জমিদার বাড়িতে নাট্য, নৃত্য, সাহিত্য সংগীতের পৃষ্ঠপোষকতা, অনুরাগ, উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং উদ্যোগ ছিল। জমিদার হরচন্দ্র চৌধুরী মনে-প্রাণে সাহিত্য সংস্কৃতির সাধক ছিলেন। তেমনি সাহিত্য সংস্কৃতির উৎসাহ উদ্দীপনা পৃষ্ঠপোষকতা ছিল কলাবাঁধা, সরিষাবাড়ী, নান্দিনা, দিগপাইত, জমিদার বাড়ি থেকে। শেরপুরের জমিদার হরচন্দ্র চৌধুরী তৎকালে বৃহত্তম ময়মনসিংহের সাহিত্য সংস্কৃতিচর্চা ও বিকাশে অগ্রবর্তী ভূমিকা পালন করেন। ১৮৬৫ সালে তিনি “বিদ্যান্নতি সাহিত্যচক্র” প্রতিষ্ঠা করে এতদঅঞ্চলে সাহিত্যচর্চায় প্রাণ সঞ্চার করেন। এই সাহিত্য চক্রের মাসিক মুখপত্র “বিদ্যান্নতি সাধিনী” বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার প্রথম সাহিত্য মাসিক হিসেবে বিবেচিত। পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠিত জামালপুর শহরের করোনেশন রিডিং কাব, ব্রাহ্ম-সমাজ লাইব্রেরী ও পাঠাগার ইত্যাদির মাধ্যমে সাহিত্যচর্চা উদ্দীপ্ত হয়। এসময় কিছু অনিয়মিত ২/১টি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এ সময়কার সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের কিছু বিবরণ পাওয়া যায় সাহিত্যিক আলহাজ গোলাম মোহাম্মদ সাহেব বিরচিত “জামালপুরের গণইতিবৃত্ত” গ্রন্থে। সংস্কৃতি সাধণার ক্ষেত্রে বিচিত্র চড়াই-উৎরাই ডিঙ্গিয়ে বর্তমানে জামালপুরের সাহিত্য-সংস্কৃতির ঐতিহ্যধারা গৌরবময় দিগন্তে ব্যাপ্তি লাভ করেছে। লণীয় যে, আজকের বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের বিভিন্ন ধারায় প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিল্পী জামালপুরের মাটিতে জন্ম নিয়েছিলেন। জামালপুরের ঐতিহ্যে সংস্কৃতিধারা আজ বিচিত্র বর্ণে গন্ধে বিচিত্র ধারার আঙ্গিকে গর্বে গৌরবে বিকশিত এবং নন্দিত।